আল-কোরআনের মূল আলোচ্য বিষয়

আল-কোরআনের মূল আলোচ্য বিষয়

আল-কোরআন ইসলামের প্রধান ধর্মগ্রন্থ, যা মহান আল্লাহ তাঁর নবী ও রাসুল মুহাম্মাদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রতি অবতীর্ণ করেছেন। কোরআন শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় গ্রন্থ নয়, বরং এটি মানবজীবনের পূর্ণাঙ্গ দিকনির্দেশনা প্রদানকারী এক অলৌকিক গ্রন্থ। এতে রয়েছে তাওহীদ (একত্ববাদ), রিসালাত (নবুওত), আখিরাত (পরকাল), ইবাদত, নৈতিকতা, সামাজিকতা, আইন, ইতিহাস, বিজ্ঞান এবং মানবজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে দিকনির্দেশনা।

কোরআনের মূল আলোচ্য বিষয়গুলোকে নিম্নোক্ত ভাগে ভাগ করা যেতে পারে:




১. তাওহীদ বা একত্ববাদ

তাওহীদ হল কোরআনের অন্যতম মৌলিক শিক্ষা। আল্লাহ তায়ালা এক ও অদ্বিতীয়, তিনি চিরঞ্জীব, সৃষ্টিকর্তা এবং সমগ্র বিশ্বজগতের অধিপতি। কোরআনের বিভিন্ন আয়াতে আল্লাহর একত্বের প্রমাণ দেওয়া হয়েছে এবং শিরকের (বহুদেবতাবাদ) বিরুদ্ধে কঠোর সতর্ক করা হয়েছে।

কোরআনের কিছু আয়াত:

  • সূরা ইখলাস (১১২:১-৪):
    "বলুন, তিনিই আল্লাহ, এক। আল্লাহ অমুখাপেক্ষী। তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং তাঁকেও জন্ম দেওয়া হয়নি। এবং তাঁর সমকক্ষ কেউ নেই।"
  • সূরা আল-বাকারাহ (২:১৬৩):
    "আর তোমাদের ইলাহ এক ইলাহ, তিনি ছাড়া অন্য কোন ইলাহ নেই, তিনি পরম দয়ালু, অসীম দয়ালু।"




২. নবুওত ও রিসালাত

আল্লাহ যুগে যুগে মানুষের হেদায়েতের জন্য নবী ও রাসুল পাঠিয়েছেন। নবীগণ আল্লাহর বার্তা পৌঁছে দিয়েছেন এবং মানুষকে সঠিক পথের দিশা দিয়েছেন। কোরআনে প্রায় ২৫ জন নবীর নাম উল্লেখ আছে, যাঁদের মধ্যে আদম (আ.), নূহ (আ.), ইব্রাহিম (আ.), মুসা (আ.), ঈসা (আ.) এবং মুহাম্মাদ (সা.) উল্লেখযোগ্য।

কোরআনের কিছু আয়াত:

  • সূরা আল-আম্বিয়া (২১:২৫):
    "আপনার পূর্বে আমি কোন রাসুল প্রেরণ করিনি, যাকে এই ওহী প্রদান করা হয়নি যে, আমি ছাড়া অন্য কোন ইলাহ নেই। সুতরাং তোমরা আমারই ইবাদত করো।"
  • সূরা আহযাব (৩৩:৪০):
    "মুহাম্মাদ তোমাদের মধ্যে কোন পুরুষের পিতা নন, বরং তিনি আল্লাহর রাসুল এবং নবীদের সীলমোহর।"




৩. আখিরাত বা পরকাল

কোরআনে মানুষের মৃত্যুর পরবর্তী জীবন সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। প্রত্যেক ব্যক্তিকে কিয়ামতের দিনে পুনরুত্থিত করা হবে এবং তার কাজের জন্য বিচার করা হবে। জান্নাত ও জাহান্নামের বাস্তবতা সম্পর্কে কোরআনে বহুবার আলোচনা করা হয়েছে।

কোরআনের কিছু আয়াত:

  • সূরা আল-বাকারাহ (২:২৮):
    "তোমরা কিভাবে আল্লাহকে অস্বীকার করছো? অথচ তোমরা মৃত ছিলে, তিনি তোমাদের জীবন দান করেছেন, তারপর তিনি তোমাদের মৃত্যু দান করবেন, তারপর আবার জীবন দান করবেন এবং অবশেষে তাঁর দিকেই তোমরা প্রত্যাবর্তন করবে।"
  • সূরা আল-হাশর (৫৯:২০):
    "জাহান্নামের অধিবাসীরা ও জান্নাতের অধিবাসীরা সমান হতে পারে না। জান্নাতবাসীরা সফলকাম।"




৪. ইবাদত ও ধর্মীয় অনুশাসন

কোরআনে মানুষের জন্য ইবাদত ও উপাসনার বিভিন্ন বিধান বর্ণনা করা হয়েছে, যার মধ্যে নামাজ, রোজা, যাকাত, হজ অন্যতম। এগুলো মানুষের আত্মশুদ্ধি, সামাজিক সাম্য ও আল্লাহর আনুগত্য প্রকাশের মাধ্যম।

কোরআনের কিছু আয়াত:

  • নামাজ: "নিশ্চয়ই নামাজ অসৎ কাজ ও অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখে।" (সূরা আনকাবুত ২৯:৪৫)
  • রোজা: "হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের ওপর ফরজ করা হয়েছিল, যাতে তোমরা মুত্তাকি হতে পারো।" (সূরা আল-বাকারাহ ২:১৮৩)
  • যাকাত: "নামাজ কায়েম কর এবং যাকাত দাও।" (সূরা আল-বাকারাহ ২:৪৩)
  • হজ: "এ বাড়ির হজ করা মানুষের জন্য আল্লাহর হক, যারা সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য রাখে।" (সূরা আলে ইমরান ৩:৯৭)





৫. নৈতিকতা ও আচার-আচরণ

কোরআন শুধু ধর্মীয় বিষয় নিয়েই আলোচনা করেনি, বরং নৈতিকতা ও শিষ্টাচার সম্পর্কেও দিকনির্দেশনা দিয়েছে। সততা, ধৈর্য, নম্রতা, বিনয়, দানশীলতা, মা-বাবার প্রতি সদ্ব্যবহার প্রভৃতি গুণাবলির প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে।

কোরআনের কিছু আয়াত:

  • সততা: "আল্লাহ ন্যায়ের নির্দেশ দেন, সৎকর্মের আদেশ দেন এবং অন্যায় ও অশ্লীল কাজ থেকে নিষেধ করেন।" (সূরা নাহল ১৬:৯০)
  • মা-বাবার প্রতি সদাচার: "তোমার রব আদেশ দিয়েছেন, তাঁকে ছাড়া অন্য কারো ইবাদত করো না এবং মা-বাবার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করো।" (সূরা আল-ইসরা ১৭:২৩)
  • ধৈর্য: "নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গে আছেন।" (সূরা আল-বাকারাহ ২:১৫৩)




৬. সামাজিক ও পারিবারিক বিধান

কোরআনে সমাজ ও পরিবারের শান্তি ও সুস্থতার জন্য বিভিন্ন নিয়ম ও বিধান দেওয়া হয়েছে, যেমন: বিবাহ, তালাক, উত্তরাধিকার, ব্যবসা-বাণিজ্য, অপরাধ ও শাস্তি, দণ্ডবিধান ইত্যাদি।

কোরআনের কিছু আয়াত:

  • বিবাহ: "তোমাদের মধ্যে যারা বিবাহযোগ্য, তাদের বিবাহ সম্পাদন করো।" (সূরা আন-নূর ২৪:৩২)
  • তালাক: "তালাক দুইবার পর্যন্ত দেওয়া যেতে পারে, তারপর সংযম করা বা সুন্দরভাবে বিদায় দেওয়া উচিত।" (সূরা আল-বাকারাহ ২:২২৯)
  • অপরাধ ও শাস্তি: "চোর, নারী হোক বা পুরুষ, তাদের হাত কেটে দাও, এটা তাদের কৃতকর্মের ফলস্বরূপ শাস্তি।" (সূরা আল-মায়েদাহ ৫:৩৮)




৭. ইতিহাস ও শিক্ষণীয় ঘটনা

কোরআনে পূর্ববর্তী জাতির ইতিহাস এবং তাদের ভালো-মন্দ কাজের ফলাফল সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে, যাতে মানুষ শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে।

কোরআনের কিছু আয়াত:

  • ফেরাউনের পরিণতি: "অতঃপর আমি ফেরাউন ও তার সেনাবাহিনীকে সমুদ্রে নিক্ষেপ করলাম।" (সূরা আল-কাসাস ২৮:৪০)
  • আদ ও সামুদ জাতির ধ্বংস: "আদ ও সামুদ জাতির মধ্যে আমি সুস্পষ্ট নিদর্শন রেখেছি।" (সূরা আনকাবুত ২৯:৩৮)




উপসংহার

আল-কোরআন মানুষের জীবন গঠনের এক পরিপূর্ণ বিধান। এটি শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় গ্রন্থ নয়, বরং মানবজাতির মুক্তির পথপ্রদর্শক। যদি মানুষ কোরআনের শিক্ষাগুলো বাস্তব জীবনে অনুসরণ করে, তবে তারা ইহকাল ও পরকালে সফলতা অর্জন করতে পারবে।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ